রবিবার, ২৫ জুলাই, ২০১০

আধুনিক এন আর আইদের করুণ উপাখ্যান

এই উপাখ্যানের নাম হতে পারত "অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়" অথবা "মডার্ন এন আর আই মে ভারত কিঁউ ছোড়া"। খুলেই বলি।

সে অনেকদিন আগে, জানেন, যখন আমি ইশকুল-টিশকুলে পড়তাম সেই সময় ছিল এন আর আইদের স্বর্ণযুগ। তখন তো আর এখনকার মতন পাড়ায় পাড়ায় এন আর আইয়ের চাষ হতনা। পাড়ায় এক পিস এন আর আই থাকলে পাড়ার ঘ্যামই বেড়ে যেত। শীতকালে এন আর আই পরিবার আসতেন, পাড়ার লোক কলার তুলে ঘুরে বেড়াত। অন্যপাড়ায় গিয়ে রেলা নিয়ে আসত। এন আর আই পরিবারের কর্তা জিনস পরে থলি হাতে বাজারে গিয়ে মহার্ঘ্য চিংড়িমাছ কিনতেন। এন আর আই গিন্নি টকটকে লিপস্টিক মেখে পার্ক স্ট্রীটের দোকান থেকে হাজার-দুহাজারের শাড়ি কিনে ননদ-ভাজদের ওয়ার্ল্ড ডর্ফে চীনে খাওয়াতেন। এন আর আই বাচ্চারা মিকিমাউস আঁকা জামা পরে ফুরফুরে ইংরিজিতে কথা বলত। সে এক দিন ছিল। কাছের লোকেরা বিকের ডট পেন পেত, আরও কাছের লোকেরা শার্ট প্যান্ট আর একদম নিজের প্রাণের লোকেদের জন্যে ঘড়ি ক্যামেরা। বাকিদের জন্যে লরির পেছনের আপ্তবাক্য "বুরি নজরওয়ালে তেরাহ মুহ কালা'। যে লোক দেশে থাকতে কোনদিন কথা বলেনি, সেই গায়ে পড়ে, "কি রে ভোম্বল কেমন আছিস? একদিন আসিস না, তোর জ্যাঠাইমা তো তোর কথা প্রায়ই বলে" বলে খেজুর করত। যে মেয়ে জীবনে কোনদিন পাত্তা দেয়নি, নাক ঘুরিয়ে চলে যেত, সেও বাপের বাড়ি এসে "ওমা ভোম্বলদা, কত ফর্সা হয়ে গেছ" বলে খুচরো বিলকিছিলকি ফ্লার্ট করত। ভোম্বলদা রোদ্দুরের দিকে মুখ করিয়ে পোলারয়েড ক্যামেরায় আত্মীয়-স্বজনের ছবি তুলতেন। তিরিশ গোনার সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার তলা নিয়ে সড়াত্ করে ছবি বেরিয়ে আসত। পাড়ার লোক অবাক হয়ে চেয়ে দেখত। চালু হত নতুন নাগরিক প্রবাদের। উফ, সে এক উজ্জ্বল সোনালী দিন ছিল এন আর আইদের।

আমরা গল্প শুনতাম। আর ভাবতাম। স্কুলে যখন রচনা লিখতে দিত "তুমি বড় হয়ে কি হবে", লিখতাম বড় হয়ে হয়ে গ্রামের স্কুলের শিক্ষক হব, বিনিপয়সায় গরীবঘরের ছেলেমেয়েদের পড়াব। দেশ গড়ব। মনে মনে ভাবতাম এন আর আই হব।

তারপরে একদিন এন আর আই হলাম। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। টিউশনির টাকায় জিআরই-টোয়েফল, বাবার টাকায় ৩৫ ডলার করে অ্যাডমিশন ফি। হো চি মিন সরণিতে লাইন। ধার করে সস্তার প্লেনের টিকিট। দু-বছরের কৃছস্রাধন। চাকরি। ধারশোধ। গাড়িকেনা। আবার ধার। চক্রবত্ পরিবর্তন্তে দুখানি চ। একখানি চ হল চক্রবৃদ্ধিহারে ধার। অন্যখানি চ - চাকরি যাবার চিন্তা।

এন আর আই হয়ে কি দেখিলাম সেলুকাস? সেলুকাস জবাব দিল, "তোমার দিন গিয়াছে এন আর আই। নিজভূমে পরবাসী হইয়া ঘ্যাম লইতে গিয়াছিলে। এখন তোমার একূল-ওকূল দুকূলই গেল। ওদিকে পরভূমে নিজবাসী হইবার চক্কর অতি প্যাঁচালো। গ্রীন কার্ডের লাইন এখন দীর্ঘ পাঁচবছর লম্বা। অ্যাপ্লিকেশানে হেয়ার লিখিয়াছিলে 'ব্ল্যাক'। গ্রীন কার্ড যদি কখনও হস্তগত হয়, হেয়ারের স্থানে লিখিতে হইবে "নান'। এই তো লাইফ।"

ওদিকে বাত্সরিক ফাঁট দেখানোর খরচ সাত-আট হাজার টাকা। চারজনের প্লেনের টিকিটই পাঁচ। বাকি টাকায় ওখানে ফাঁটও তেমন দেখানো যায় না। দেখাব কি মশাই, ওয়ালমার্টে কেনা র‍্যাংলার জিন্স পরে বাজার করতে গিয়ে দেখি মাছওলা ব্যানানা রিপাব্লিক পরে মাছ বেচছে। তার শালা এন আর আই। দাগাটা সামলে দরদাম করতে গিয়ে হ্যাটা হলাম। পাশ দিয়ে হাঁটুর বয়েসি সেকটর ফাইভ স্যান্ট্রো চালিয়ে এসে এসে দই খেয়ে চলে গেল। হাতে রইল থলি।

বাকি যে দুর্গ ছিল, ফান্ডা, তাতেও মৌরসী পাট্টা নাই। বন্ধুকে ওবামা সম্পর্কে নিজের অন্তর্দৃষ্টির হকিকত্ বাতলাতে গিয়ে বন্ধুর বন্ধুর থেকে শুনে এলাম ওবামা, অ্যামেরিকান ইলেকশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স সহজে পাবার উপায়, নর্থ ডাকোটার আবহাওয়া, রোড আইল্যান্ডের পাবলিক ট্র্যাসপোর্টেশন থেকে কেজান কুইজিনের নাড়িনক্ষত্র। তিনি অ্যামেরিকা বিশেষজ্ঞ। তিনমাস ছিলেন। ওক্লাহোমায়। খাপ খোলার কোনরকম চান্সই নেই। তার ওপর পাঁচমিনিট আগেই তিনি ভিড় চৌরঙ্গিতে এমনি এমনি চারবার এপার ওপার করে সাইকোলজিকাল ওয়্যারফেয়ারের পয়লা রাউন্ড হ্যান্ডস-ডাউন জিতেছেন। আমি তখন গাড়ির স্রোতে ভ্যাবাচ্যাকা। অলরেডি দুবার মুটের "এই খবর্দা-আ-র' খেয়েছি। আবার বেশি ট্যাঁফোঁ করলে ভিড় প্রাইভেট বাসে উঠে আমাকে সাইকোলজিকালি একেবারে নিষ্পেষিত করে দেবেন বলে ভয় দেখিয়ে রেখেছেন।

কি বলব দাদা, এই এন আর আই জীবনে ঘেন্না ধরে গেল। দাও ফিরে সেই অরণ্য, লও এ নগর। এখন সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে বাচ্চাদের রচনা লিখতে শেখাই, "হোয়েন আই গ্রো আপ, আই ওয়ান্ট টু গো ব্যাক টু মাই পেরেন্টস কান্টি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিকাম এন ইন্ডিয়ান"।

[২০শে এপ্রিল, ২০০৮ guruchandali.com]

মঙ্গলবার, ১৫ জুন, ২০১০

মোগলাই সাহেবসুবো

বেশ কয়েকবার বইটা শেল্ফে দেখেছি । এয়ারপোর্টের বইয়ের দোকানে, ব্যাঙ্গালোরের বইয়ের দোকানে, পাড়ার লাইব্রেরিতে, অফিসের লাইব্রেরিতে । একবার ব্লার্বে novel কথাটা চোখে পড়ায়, উল্টেপাল্টে দেখার ইচ্ছে হয়নি । অত মোটা ইংরিজি প্রেমের উপন্যাস পড়ার আকর্ষণ আমার কোনদিনই ছিল না । শেষ পর্যন্ত, অফিসের লাইব্রেরিতে পড়ার মতন কোন বই না পেয়ে একরকম বাধ্য হয়েই নিয়েছিলাম White Mughals । লেখক, William Dalrymple । মোটকা বই । পরে দেখেছি শেষের Glossary, Bibliography, Index বাদ দিয়ে উপাখ্যান শেষ হয় ৫০১ পাতায় ।

উপন্যাস নয় । ইতিহাস । অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের ক'বছর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ক'বছর হল মূল কাহিনীর সময়সীমা । তবে খেইয়ের সুতো শুরু হয়েছে তার অনেক আগে, শেষ হয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীর আটের দশকে । ইতিহাসের নায়ক জেমস কার্কপ্যাট্রিক । হায়দ্রাবাদে নিজমের দরবারের ব্রিটিশ রেসিডেন্ট । নায়িকা হায়দ্রাবাদের অভিজাত পরিবারের ইরাণী বংশোদ্ভুত মেয়ে খয়েরউন্নিসা । এদের প্রেমকে ঘিরে যে ইতিহাসের জাল বুনেছেন তাতে কে নেই ! আছেন নিজাম ও তার প্রধানমন্ত্রী; হায়দ্রাবাদের ইরাণী বংশোদ্ভুত অভিজাত পরিবার; লর্ড কর্নওয়ালিস, জন শোর, লর্ড ওয়েলেসলি; মারাঠা পেশোয়া; টিপু সুলতান ...

অসম্ভব পরিশ্রমের কাজ । দীর্ঘ অধ্যবসায়ে বিভিন্ন মহাফেজখানা ঘুরে, লন্ডন-দিল্লি-হায়দ্রাবাদ ঘুরে খুঁটে খুঁটে সংগ্রহ করা তথ্য জোড়া লাগিয়ে লাগিয়ে গল্পের যে গালিচা বুনেছেন তার তুল্য ইতিহাস আমি অন্ততঃ পড়িনি । আর লেখার এমনই গুণ, চরিত্র আর ঘটনাগুলো চোখে দেখা যায় । এই "চোখে দেখা যায়" শব্দবন্ধটি এত ব্যবহৃত হয় যে এ দিয়ে আর ঠিক মনের ভাব প্রকাশ করা যায়না বটে, কিন্তু এ ছাড়া আর কোনভাবে অনুভবটা ঠিক প্রকাশ করা যেত না । চোখে দেখানো ছাড়াও যে আবহ (উর্দুতে কী যেন বলে, মাহোল? সংস্কৃতে বাতাবরণ? বাংলায়?) তৈরী করেছেন, সেটা কোন ঐতিহাসিক নয়, ঔপন্যাসিকের উপযুক্ত কাজ । কেয়াবাত !!

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

Unicode, Unicode

ইউনিকোডে লেখার প্রচেষ্টা করছি | যদি পাঠকের মেশিনে কোন ইউনিকোড ফন্ট বসানো থাকে, তাহলে এই লেখা বাংলায় দেখতে না পাবার কোন কারণ নেই | তবে অক্ষরের ছাঁদ কিরকম হবে, সেটা নির্ভর করছে পাঠকের মেশিনে কোন ইউনিকোড ফন্ট বসানো আছে তার ওপর | যদি একাধিক ইউনিকোড ফন্ট থাকে, তাহলে দেখতে হবে ডিফল্ট ইউনিকোড ফন্ট  কোনটা | মাইক্রোসফট বৃন্দা নামের একটা ইউনিকোড ফন্ট ডিফল্ট হিসেবে দেয় | বেশ বাজে দেখতে | এনকোডিং-এও কিছু গড়বড় আছে মনে হয় | এককভাবে খন্ড-ত (ৎ) লেখা যায়না | বাংলার সবথেকে পপুলার ইউনিকোড ফন্ট সোলেইমানলিপিতেও একই অসুবিধে লক্ষ্য করছি | আর একটু ঘাটাঘাঁটি করতে হবে | তবে ফ্রি-স্যান্স, ফ্রি-সেরিফ কি একুশে দুর্গা বা ব্যাঞ্জন রূপালী ইত্যাদি ফন্টে সেই সমস্যা নেই | আশা করছি, দিন কয়েকের মধ্যে এ ব্যাপারে আরও কিছু ফান্ডা করতে পারব | বঙ্গলিপির ইউনিকোড সাপোর্ট ইমপ্লিমেন্ট করতে গিয়ে প্রচুর শেখা হচ্ছে |

রবিবার, ২৫ মে, ২০০৮

তিন পাহাড়ের গান

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা প্রথম পড়ি বোধহয় যখন আমি স্কুলে কি কলেজে পড়ি । অল্প বয়েসের কাঁচা মনে খুবই দাগ কেটেছিল । বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কোনদিন ডাকসাইটে কবি ছিলেন না । জীবনানন্দ, বিষ্ঞু দে অথবা শক্তি-সুনীলের সঙ্গে একসঙ্গে কখনই ওনার নাম বলা হত না । অথচ ওরকম একক ও বলিষ্ঠ স্বর আমি বোধহয় আর কারও কবিতায় পাইনি । ঐ একই সময়ে স্কুল অফ পীপলস আর্টের একটা ক্যাসেট হাতে আসে । বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার পাঠ আর সুর দিয়ে গান । সুর করেছিলেন বিনয় চক্রবর্তী । অসামান্য কাজ । কবিতার বই আর এই ক্যাসেট - দুয়ে মিলে বীরেন চাটুজ্জে আমার মধ্যে জেঁকে বসছিলেন ।




খুব ভাল লেগেছিল 'তিন পাহাড়ের গান' কবিতাটা । "পাহাড়িয়া মধুপুর মেঠো ধূলিপথ / দিনশেষে বৈকালী মিষ্টি শপথ" । অসম্ভব প্রাণবন্ত চিত্রকল্প । এসময়ে আমি নিজেও টুকটাক সুর-টুর করতে আরম্ভ করেছি । তো এই "তিন পাহাড়ের গান"-এও সুর করি এই সময়ে । পুরোটা নয় । কবিতাটা আরও লম্বা । কিন্তু যেখানে মনে হয়েছিল গান শেষ হওয়া উচিত, সেই অব্দিই সুর করেছিলাম । সেটা বোধহয় ১৯৮৮-৮৯ সাল । নিজের জন্যে করা, নিজের কাছেই রাখা ছিল । কাউকে শোনানো হয়নি । তার প্রায় বছর বারো-চোদ্দ পরে পারমিতার উৎসাহে ও প্ররোচনায় একে ওকে শোনাই । তারও পরে, ২০০৭ সালে এসে অ্যারেঞ্জ করি গানটা । এই সেই গান ।